জন্ম যাদের মাঝ আকাশে
ট্রাভেল বাংলাদেশ স্পেশাল : মাঝ আকাশে জন্ম নেয়া শিশু-র নাগরিকত্ব নিয়ে কী জটিলতা তৈরি হয়?
বাড়িতে, হাসপাতালে, নিজ দেশে অথবা বিদেশের মাটিতে-যে কোনো জায়গাতেই শিশুর জন্ম হলে কেউ অবাক হন না। কারণ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি শিশুর জন্ম হয় মাঝ আকাশে অর্থাৎ বিমানে, তখন সে ঘটনার পরের অংশটুকু জানতে ইচ্ছে করে না কার? কথিত আছে, বিমানে জন্ম হলে শিশু বাড়তি সুবিধা পায় আজীবন।
মাটি থেকে কয়েক হাজার ফুট ওপরে যে শিশুর জন্ম সে শিশুর জন্মসনদই বা তৈরি হয় কীভাবে? তাদের নাগরিকত্ব হয় কোন দেশের? এসব বিষয়েই জানব আজকের লেখায়।

এয়ারলিন
ফ্লোরিডার মিয়ামি পার হওয়ার সময় ১৯২৯ সালের ২৬ অক্টোবর বিমানে ভূমিষ্ঠ হয় এয়ারলিন নামে একটি ফুটফুটে কন্যাশিশু। মধ্য আকাশে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু সে। বাবা ডক্টর থমাস ইভান্স এবং মা মার্গারেট ইভান্স কিছুটা আঁচ করেছিলেন বিমানে এয়ারলিনের জন্ম হতে পারে। সে হিসেবে প্রস্তুতি নিয়েই তারা বিমানে উঠেছিলেন। ঘটনার দিন এক বছর পুরনো প্যান আমেরিকান ফিল্ড (বর্তমানে মিয়ামি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট) থেকে তারা বিমানে ওঠেন। বিমানের পাইলট ছিলেন সি ডব্লিউ সুইনসন। ফ্লাইটে বাবা-মা ছাড়াও আরও ছিলেন চিকিৎসক, নার্স, একজন কো-পাইলট ও শিশুটির নানী। বিমান উড্ডয়নের মাত্র ২০ মিনিট পরই এয়ারলিনের জন্ম হয়।শিশুটির জন্মের অল্প সময় পরই বিমানটি বিসকেন বে নামের উপহ্রদটি পার করে অবতরণ করে। এয়ারলিনকে বলা হয় বিমানে জন্ম নেয়া প্রথম শিশু। তবে তথ্যটি সঠিক কিনা সে নিয়ে বেশ খোঁজাখুঁজি করা হয়। জানা যায়, ফ্রান্সের শহর লিইওঁর ম্যাদাম জর্জেস ব্রেয়ারের ছেলে গাইনেমার ১৯২২ সালে প্রথম বিমানে জন্ম নেয়। প্রসববেদনা ওঠার সময় শিশুটির মা দক্ষিণ ইতালির সমুদ্রের পাড়ে একটি রিসোর্টে ছিলেন। দ্রুত নেপালের একটি প্লেনে করে তাকে হাসপাতালে নেয়ার সময় নেপাল থেকে ৪০ মাইল দক্ষিণে মেডিটেরেনিয়ান সমুদ্রের ৬,০০০ ফুট উঁচুতে সন্তানের জন্ম দেন। ফ্রেঞ্চ মিলিটারি পাইলট জর্জেস গাইনেমারের নামানুসারে শিশুটির নাম রাখা হয় গাইনেমার। এত আগের ঘটনা হওয়ায় এটি নিয়ে তেমন কোনো তথ্য আর পাওয়া যায়নি।

সোনা ক্রিস্টি ইভ
১৯৯০ সালে ডেবি ওয়েনস নামে এক নারী চার বছর বয়সী মেয়ে ক্লেরিকে নিয়ে ঘানা থেকে লন্ডনে আসছিলেন। ফ্লাইটের বাথরুমে গিয়ে তিনি বুঝতে পারেন তার শরীর থেকে রক্তপাত হচ্ছে। পেটের সন্তানের কিছু হয়েছে ভেবে দ্রুত ইমারজেন্সিতে কল করেন। সৌভাগ্যবশত ফ্লাইটে উপস্থিত একজন চিকিৎসকের সাহায্যে ডেবির সন্তান ভূমিষ্ঠ হয় বিমানেই। বিমানের ফার্স্ট ক্লাস সেকশন খালি করে দেয়া হয়েছিল ডেবির সন্তানের জন্মের জন্য। শিশুটির নাম রাখা হয় সোনা ক্রিস্টি ইভ (ইংরেজিতে বানান করলে তিনটি শব্দের প্রথম অক্ষর মিলিয়ে হয় ‘স্কাই’ অর্থাৎ ‘আকাশ’)।
কাদিজু
২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে তার্কিশ এয়ারলাইনসে চেপে গিনির কোনাক্রি থেকে বুরকিনা ফাসোর উগাডোগুতে যাচ্ছিলেন ২৮ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট নারী নাফি ডিয়েবি। যেহেতু প্রেগন্যান্সির ৩৬ সপ্তাহ পর্যন্ত বিমানে ওঠার অনুমতি ছিল তাই তিনি ভাবেননি মাটি থেকে কয়েক হাজার ফুট উপরে তার প্রসব ব্যথা উঠবে। তাই সেরকম কোনো প্রস্তুতিও তিনি নেননি। কিন্তু, নাফির হুট করে ব্যথা ওঠার বিষয়টি দূর থেকে খেয়াল করেছিলেন একজন ক্রু। কেবিন ক্রুদের সহায়তায় দুই ঘণ্টা দশ মিনিটের ফ্লাইটে নাফি জন্ম দেন কাদিজু নামে একটি ফুটফুটে কন্যাশিশুর। শিশুটির জন্মের পর তাকে দেখে একদম মনে হয়নি মা নাফি ২৮ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট ছিলেন। তিনি মিথ্যা বলেছিলেন কিনা সেটি নিয়ে অবশ্য সে সময় কিছু প্রশ্নের জন্ম হয়েছিল।
বিমানের শিশুদের নাগরিকত্ব ও ভ্রমণ খরচ
শিশুর জন্ম আকাশে হলে তার জন্মস্থান নিয়ে কিছুটা দ্বিধা তৈরি হয়। এমন অবস্থা হলে কিছু বিষয়ের দিকে নজর দিতে হয়। প্রথমত, কিছু দেশ শিশুটিকে নাগরিকত্ব দেয় যদি বিমানে জন্ম নেয়া শিশু সে দেশের মাটির ওপরেই অবস্থান করে। একে বলা হয় জুস সালি অথবা মাটির অধিকার। কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ হাতে গোনা কিছু রাষ্ট্রেই এই সুবিধা মেলে। ইউরোপের কোনো রাষ্ট্রে এমন সুবিধা নেই। দ্বিতীয়ত, কিছু দেশের ক্ষেত্রে, শিশুটি যে দেশের মালিকানাধীন বিমানে জন্ম নিয়েছে, সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করে। এই নিয়মটি করা হয়েছে সামুদ্রিক আইন থেকে। সাগর ও মহাসাগর যেহেতু কোনো দেশের অধীনে পড়ে না এবং বিমানের চেয়ে জাহাজে শিশু জন্মগ্রহণের ঘটনা বেশি ঘটে তাই সেই জাহাজে জন্ম নেওয়া শিশুদের অনেক সময় জাহাজের মালিকানার দেশের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। সব দেশ আবার এই নিয়মের অন্তর্ভুক্ত নয়।
নাবিলা বুশরা এস এম